বুধবার   ১৩ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৮ ১৪২৬   ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

আজকের নাটোর
সর্বশেষ:
লালপুরে নারী আনসার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার বাগাতিপাড়ায় বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার
৯০

শিশু রোগীদের নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই

ডেস্ক নিউজ

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০১৯  

'টানা পাঁচ দিন গোসল নেই। ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়াও হচ্ছে না। পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে বাঁচানোর জন্য এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে দৌড়াচ্ছি। বাসায় আরেক মেয়ে না খেয়ে থাকছে। কারণ, তার বাবাকে হাসপাতাল-অফিস দুটিই সামলাতে হচ্ছে।' কথাগুলো বলছিলেন ফার্মগেটের বাসিন্দা হাসিনা আক্তার। বিমর্ষ, ক্লান্ত নিদ্রাহীন চোখ। পাশে শুয়ে থাকা মেয়ে নুসাফফারি মুসলানের দুই হাত দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, 'ছোট বাচ্চা। অথচ দুইটা হাতে একটার পর একটা ইনজেকশন। ব্যথায় প্রায় সময়ই কুঁকড়ে ওঠে। কারোর সঙ্গে কথাও বলছে না। মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমিও অসুস্থ হয়ে পড়েছি।'

শেরেবাংলা নগরে ঢাকা শিশু হাসপাতালের 'বি' ব্লকের দ্বিতীয় তলায় শিশু ওয়ার্ড ২। এখানে বড় করে দেয়ালে লেখা আছে 'ডেঙ্গু সেল'। এ সেলেই চিকিৎসা নিচ্ছে হাসিনা আক্তারের মেয়ে মুসলান। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ১৮ জুলাই থেকে রূপনগরের সুরক্ষা জেনারেল শিশু হাসপাতাল ও পরে শ্যামলীর ট্রমা  সেন্টারে দুই দফা ভর্তি হয় মুসলান। পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে ট্রমার আইসিইউতে রাখা হয় তাকে। পরে এখানে আনা হয়।

'ডেঙ্গু সেল'-এ অন্যান্য শিশুর মতো চিকিৎসা নিচ্ছে যাত্রাবাড়ীর এক মাদ্রাসার ছাত্র সিয়াম আহমেদ। তাকে গুরুতর অবস্থায় গত বুধবার ভর্তি করা হয়েছে। সিয়ামের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। পরিবারের সবাই গ্রামের বাড়িতেই থাকে। ছেলের জ্বর হওয়ার খবর শুনেই ঢাকায় ছুটে আসেন সিয়ামের মা বিউটি বেগম। তিনি বলেন, ছেলের জ্বর হওয়ার কথা আগে জানানো হয়নি। তবে ডেঙ্গু ধরা পড়লেই জানতে পারি। এর আগে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এমনকী তার পেটে ও ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ায় আইসিইউতেও রাখা হয় এক রাত, একদিন। পরিবারের সবাই চিন্তায় আছে।'

সেলের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাপলা আক্তার জানান, ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে ২১ জুলাই থেকে এই সেল করা হয়। সেলে বেড সংখ্যা ৭টি। রোববার পর্যন্ত এই সেলে মোট ১০ জন শিশু ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এদিকে, শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে কথা হয় শিশু সুমাইয়ার মা নাজমা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, ওর বয়স সাড়ে ৩ বছর। চার দিন আগে এই হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে অবস্থায় ভর্তি হয় সুমাইয়া। তার পেটে পানি জমেছে। এর আগে রূপনগরের একটি হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সুমাইয়াকে রক্ত দিতে হয়েছে। অভিভাবকরা জানিয়েছেন, গত সাত দিনে চিকিৎসায় এক লাখ টাকার উপরে খরচ হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রক্তে ব্যয় বেশি।

শুধু মুসলান, সিয়াম বা সুমাইয়াই নয়, শিশু হাসপাতালে প্রতিদিন অর্ধশতাধিক শিশু ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের মধ্যে সিট খালি থাকলে কর্তৃপক্ষ ভর্তি করছে। বাকিরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। আর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের মানুষগুলোও আপনজনকে বাঁচানোর জন্য রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটছেন। কেউ কেউ আর্থিক সংকটের কারণে সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।

হাসপাতালের নার্সরা জানান, এখানে বর্তমানে ৮৭টি বেডে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ১২ শিশু। এ ছাড়াও রোববার থেকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে 'ডেঙ্গু ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার' খোলা হয়েছে। এই সেন্টার থেকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত শিশুর অভিভাবকরা সহজেই ভর্তি-সংক্রান্ত সব তথ্য পেতে পারেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীর চাপে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। জরুরি বিভাগে শিশুদের কোলে নিয়ে অনেক অভিভাবককেই ছুটে আসতে দেখা যায়। এখানে কথা হয় স্যালাইন লাগানো ডেঙ্গু রোগী সায়মার অভিভাবক আব্দুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, চার দিন জ্বরে আক্রান্ত ছিল তিন বছর বয়সী মেয়ে সায়মা। পরে জ্বর ভালোও হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ করেই শরীরের তাপমাত্রা কমে গেছে। তাই আবার চিকিৎসকের কাছে গেলে রক্ত পরীক্ষা দেন। পরে জানা যায় যে সায়মার ডেঙ্গু হয়েছে। তাই হন্যে হয়ে একটি সিটের আশায় ঢাকা শিশু হাসপাতালে তিনি ছুটে এসেছেন।

হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সাফি আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু এখন পুরো রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে জ্বর আসে। তিন থেকে চার দিন জ্বর থাকতে পারে। আবার ভালো হয়েও যেতে পারে। জ্বর কমলেও পরবর্তী দু'একটা দিন সতর্ক থাকতে হবে। রোগীর চাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্যান্য হাসপাতালের মতো শিশু হাসপাতালেও রোগীর চাপ বেশি। তা সামলাতে আমরা ডেঙ্গু সেল করেছি।

ডা. সৈয়দ সাফি আহমেদ জানান, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এবার প্রায় সবাই ডেঙ্গু হেমারজিক ফিভারে আক্রান্ত হচ্ছে। আগে ছিল ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু রোগী। এদের পঞ্চাশ ভাগেরই শক সিন্ড্রোম। শক সিন্ড্রোম অর্থ হচ্ছে পালস (নাড়ির গতি) পাওয়া যায় না। এবার ডেঙ্গুর লক্ষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদের সবার রক্তের প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বর হলে গাফিলতি না করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

আজকের নাটোর
আজকের নাটোর
এই বিভাগের আরো খবর